নিউজ

পশ্চিমবঙ্গেই প্রথম শুরু হয় মেয়েদের জন্য বিশেষ পত্রিকা

পশ্চিমবঙ্গেই প্রথম শুরু হয় মেয়েদের জন্য বিশেষ পত্রিকা

সময়টা আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর কিংবা তারও কিছু আগের যে সময় নারীর স্বাধীনতা বলে তেমন কিছুই ছিল না। শুধু সংসারের চার দেয়াল যাদের জগত ছিল। সেই সময়ের কথাই বলছি, ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে বা ১২৭০ বঙ্গাব্দের কথা। সেই উনিশ শতকেই নারীদের জন্য প্রথম প্রকাশিত সাময়িক পত্রিকা ছিল মাসিক পত্রিকা। প্রকাশ করেছিলেন ডিরােজিওর দুই শিষ্য প্যারীচাঁদ মিত্র এবং রাধানাথ শিকদার ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ১৬ই আগস্ট তারিখে। এরপর উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মেয়েদের জন্য অনেক সাময়িক পত্রিকা হয়েছিল যেমন- ‘অবলাবান্ধব পত্রিকা, ‘বঙ্গমহিলা,” বিনােদিনী’, ‘হিন্দুললনা’ ইত্যাদি।তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ন ছিল ‘বামাবােধিনী’ পত্রিকা।১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার নারীদের মধ্যে শিক্ষার আলাে এবং সচেতনতা আনার জন্য এবং তাদের মনের কথা তুলে ধরার জন্য উমেশচন্দ্র দত্ত এই পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। এই পত্রিকাটি উমেশচন্দ্র দত্ত তার মৃত্যু ১৯০৭ অবধি চুয়াল্লিশ বছর ধরে সম্পাদনা করেন।

আরও পড়ুন :  মারিউপোল কার্যত এখন ধ্বংসস্তূপ! রাস্তার পাশেই দেওয়া হচ্ছে গণকবর

বামাবােধিনী পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল বামাবােধিনী সভার উদ্যোগ। বামাবােধিনী সভা কেশবচন্দ্র সেন এবং ব্রাহ্ম আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল।১৯৬৩ সালে বামাবােধিনী সভার কার্যালয় থেকে বামাবােধিনী পত্রিকা প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিল। মূল্য ছিল মাত্র এক আনা আর মুদ্রণ সংখ্যা ছিল এক হাজার। প্রথম গ্রাহিকা ছিলেন ভুবন মােহিনী বসু। ১৮৭৭ খ্রিঃ বামাবােধিনী সভা বন্ধু হয়ে গেলেও বামাবােধিনী পত্রিকা টিকেছিল আরও ষাট বছর, অর্থাৎ ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।উনিশ শতকে শিক্ষার উন্নতি ও নারীশিক্ষা আন্দোলনে উমেশচন্দ্র দত্তের অবদান অনস্বীকার্য। উমেশচন্দ্র দত্ত স্মরণীয় হয়ে আছেন বামাবােধিনী পত্রিকার সম্পাদনার জন্য। তিনি একাদিক্রমে চল্লিশ বছর এই পত্রিকার দায়িত্ব বহন করেছিলেন।

বামাবােধিনী পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয় আলােচিত হত,যেমন ভ্রমণ বৃত্তান্ত,গল্প,উপন্যাস, কবিতা,চিত্রকলা,বিজ্ঞান, বিশ্লেষণ,বিদেশী নারী সাফল্য কাহিনী শিক্ষা প্রসঙ্গ, স্বাস্থ্য জ্ঞান,শিশুপালন পদ্ধতি,ধর্ম আলােচনা এবং গার্হস্থ্য প্রসঙ্গ। তবে প্রধান বিষয়বস্তু ছিল তিনটি প্রয়ােজন শিক্ষার, সার্থকতা, শিশুপালন সংক্রান্ত নিয়মাবলী এবং পরিবারে রমণীর কর্তব্য ও স্থান। এই পত্রিকার অধিকাংশ লেখক ছিলেন পুরুষ অবশ্য মেয়েরাও লিখেছিলেন। তবে কোন অজ্ঞাত কারণে বেশিরভাগ নিজেদের নাম উল্লেখ করেননি।জগদীশ চন্দ্র বসুর ভগিনী-দ্বয় লাবন্যপ্রভা বসু ও স্বর্ণপ্রভা বসু, কৃষ্ণভামিনী দাস ও শৈলবালা জায়া এবং পরবর্তী কালে মানকুমারী বসু লিখেছিলেন। তবে অধিকাংশ লেখিকা ছিলেন অনামা গৃহবধূ।

 

বামাবােধিনী পত্রিকায় বনলতা দেবী সােচ্চার না হয়ে মধ্যবর্তী অবস্থান নিয়েছিল।নারীশিক্ষা, নারী স্বাধীনতার সর্বোপরি সমাজে ও পরিবারে নারীর ভূমিকাকে তুলে ধরেছিল এবং মূল্যায়ন করেছিল। বামাবােধিনীতে বাল্যবিবাহের আলােচনা থাকলেও, যে আলােচনা বা বিলের প্রসঙ্গে সারাদেশে যে ঝড় উঠেছিল তার কোনাে সংকেত ছিল না বামাবােধিনী পত্রিকায়।এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় লেখা হয়েছিল- ভাষাতত্ত্ব, ভূগােল, ইতিহাস,জীবনচরিত,বিজ্ঞান, স্বাস্থরক্ষা, নীতি ও ধর্ম, দেশাচার, পদ্য, গুহঃচিকিৎসা, শিশুপালন, শিল্পকর্মগৃহকাৰ্য্য ও অদ্ভুতবিবরণ প্রকাশিত হইবে। বামাবােধিনীর উদ্দেশ্য স্পষ্টতর রূপে প্রকাশ পেল পঞ্চাশ বছর পূর্তির সময়ে।সেই সময়ে পত্রিকায় পরিষ্কার করে বলা হয় বঙ্গ রমণীগনকে সর্বপ্রকার জ্ঞানে বিভূষিত করা বামাবােধিনীর উদ্দেশ্য,এইজন্য সর্বপ্রকার জ্ঞান প্রস্তাবই ইহাতে সন্নিবেশিত হইয়াছে। দীর্ঘ ষাট বছরের এমন একটি সফল উদ্যোগে জুড়ে ছিলেন সে সময়ের অনেক নারী। ব্যক্তিগত লেখালেখিকেও, নারীর নিজস্ব স্বরকে তুলে ধরতেও ত্রুটি রাখেনি বামাবােধিনী।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button