Uncategorized

চিরকুমারী রাজকন্যা জেবুন্নেসার জীবনের শেষ দিন কাটে কারাগারের অন্ধকারে

চিরকুমারী রাজকন্যা জেবুন্নেসার জীবনের শেষ দিন কাটে কারাগারের অন্ধকারে

মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব
খুবই সাধাসিধে ধরনের একজন বাদশাহ ছিলেন।রাজ কোষের অর্থ তিনি কখনও নিজের জন্য খরচ করেনি।টুপি সেলাই আর কোরাঅান লিখে নিজের জীবিকা নির্বাহ করেছেন তিনি।তার পুরো নাম হল আল আজম ওয়াল খাকান আল মুকাররম আবুল মুজাফফর মুহি উদ্দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগির।তার পিতা পঞ্চম মুঘল বাদশাহ তাজমহল নির্মাতা শাহজাহান আর মাতা আগ্রার তাজমহল শায়িতা মুমতাজ।আর এই ন্যায় পরায়ন সম্রাট আওরঙ্গজেব ও তার প্রথম সহধর্মিণী সম্রাজ্ঞী দিলরাস বানু বেগমের কন্যা হলেন জেবুন্নেসা।১৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারী জেবুন্নেসার জন্ম।সম্রাট আওরঙ্গজেব আদর করেই কন্যার নাম জেবুন্নেসা রেখেছিলেন যার অর্থ “ললনাশ্রী”।

 

জেবুন্নেসা বিদুষী ছিলেন ছিলেন চিরকুমারী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রখর বুদ্ধির অধিকারিণী, যে কোনাে কিছু খুব দ্রুত মুখস্থ করে ফেলতে পারতেন। মাত্র তিন বছর বয়সে কোরআন মুখস্থ করতে শুরু করেন। যে বয়সে অনেকে ঠিকভাবে কথাই বলতে পারে না। সেই বয়সে কোরআন মুখস্থ করতে শুরু করেন জেবুন্নেসা।৭ বছর বয়সে কোরআনে হাফেজা হন তিনি। এই খুশিতে সম্রাট আওরঙ্গজেব জেবুন্নেসাকে ৩০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা উপহারস্বরুপ প্রদান পূর্বক একদিন সরকারী ছুটি ও বিপুল ভােজের আয়ােজন করেছিলেন। হাফেজা হওয়ার পর তিনি আরবি, ফারসি আর উর্দু ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করেন। তার কবি প্রতিভাও ছিল অসামান্য।এতাে প্রতিভা থাকায় নানান বিষয়ের পন্ডিতদের নিয়ােগ দেয়া হয় জেবুন্নেসাকে পারদর্শী করতে।

 

একবার পারস্যের বাদশা স্বপ্নের মধ্যে একটি কবিতার ছত্র মুখস্থ করেন এবং সেটি পাঠিয়ে দেন দেশের কবি সাহিত্যিকদের অনুরূপ আরেকটি ছত্র লেখার জন্য। কিন্তু কেউ এর সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি।তারপর সেটি অন্তঃপুরে জেবুন্নেসার কাছে পাঠালে তিনি একটু চোখ বুলিয়েই ঐ বাক্যের নিচে আর একটি বাক্য লিখে দেন।পারস্যে যখন লেখাটি পৌছাল তারা লেখিকাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করলেন, আর পারস্যের জ্ঞানগুনীরাও সুলতানকে অনুরােধ করলেন এই বিখ্যাত নারীকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য আমন্ত্রন জানাতে।নাতির এই সুসংবাদে খুশি হয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহানও।জেবুন্নেসা গােপনে সাহিত্য ও কাব্য দলগুলােতে অংশ নিতেন, যেখানে গনি কাশ্মীরি, নাই’মাতুল্লাহ খান প্রমুখ মহান কবিরা অংশ নিয়েছিলেন।জেবুন্নেসা পড়ালেখার প্রতি অনেক বেশি আগ্রহী ছিলেন।কিন্তু ব্যক্তি জীবনে অবিবাহিত ছিলেন এই রাজকুমারী। তবে এজন্য কম সমালােচনার স্বীকার হননি তিনি।প্রাসাদ এবং প্রাসাদের বাইরে তার চরিত্র নিয়ে নানান গুজব ছড়ানাে হয়। তবে এতে কিছুই এসে যায়নি রাজকুমারীর।

 

তিনি নিজের মতােই কাজ করেছেন সারা জীবন। জেবুন্নেসা ছিলেন একজন দয়ালু হৃদয়বান ব্যক্তি এবং সর্বদা প্রয়ােজনে ব্যক্তিদের সহায়তা করেতেন।সংগীতের প্রতিও আগ্রহী হয়েছিলেন এই রাজকুমারী।আওরঙ্গজেব তার মেয়ের প্রতিভা এবং ক্ষমতা সম্পর্কে জানতেন।কন্যাও তার বাবাকে সাধ্যমতাে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন।সম্রাট আওরঙ্গজেবের জেবুন্নেসা ছাড়াও আরাে চার কন্যা ছিল।রাজকন্যা হলেও জাঁকজমক জীবন পছন্দ ছিল না জেবুন্নেসার।রাজকন্যা হলেও জাঁকজমক জীবন পছন্দ ছিল না জেবুন্নেসার।

বাবা সম্রাট আওরঙ্গজেব অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে লাহােরে নিয়ে চিকিৎসা করান জেবুন্নেসা। তবে ধীরে ধীরে সম্রাটের বিশ্বাস রাজকুমারীর উপর থেকে উঠে যেতে থাকে। সম্রাটের এক পালক পুত্র ছিল আকিল কাহন। তার সঙ্গে জেবুন্নেসার প্রেমের সম্পর্ক আছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সম্রাটের কানে এই খবর গেলে তিনি খুবই রেগে যান এবং আদরের কন্যা জেবুন্নেসাকে কারাগারে বন্দি করেন।শাস্তি ছিল তার জমানাে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, তার বার্ষিক ৪ লাখ টাকা পেনশন বাতিল করা এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেলিমগড়ে বন্দি থাকবেন। এখানে বিশ বছর কারাবাসের পরে ১৭২৪ সালে জেবুন্নেসা সাত দিন অসুস্থতার পরে শাহজাহানবাদে বন্দি অবস্থায় মারা যান।তবে তার সমাধি নিয়েও রয়েছে অনেক তর্ক বিতর্ক। কেউ বলেন রাজকন্যা জেবুন্নেসার সমাধি লাহােরে, কেউ বলেন পাকিস্তানে নয়, অন্য কোথাও সমাধি দেয়া হয়েছে তাকে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button