লাইফস্টাইল

Jamai Sasthi : জামাইষষ্ঠীর প্রচলন হল কীভাবে জানেন কি? জামাইষষ্ঠীর ইতিকথা জানুন

Jamai Sasthi: বাঙালীর বারো মাসে তেরো পার্বণ লেগেই থাকে।এই তেরো পার্বণের মধ্যে একটি হল জামাইষষ্ঠী।সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ষষ্ঠীতে পালন করা হয় জামাইষষ্ঠী। এ বছর ২১শে জ্যৈষ্ঠ অর্থাৎ ৫ জুন, রবিবার পালিত হয়েছে এই শুভ অনুষ্ঠান। হিন্দু মতে মা ষষ্ঠী আসলে সন্তান-সন্ততির দেবী। বাংলার বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবীর মধ্যে অন্যতম হলেন ষষ্ঠী দেবী।

সন্তানের সুখ-সৌভাগ্য কামনা করে, এমনকি সন্তান লাভের জন্যও ষষ্ঠী দেবীর পুজো করা হয়। তিনি গর্ভবর্তী হওয়ার আশীর্বাদ দেন। জামাইষষ্ঠীর মুখ্য উদ্দেশ্য হল, মাতৃত্ব, বংশবৃদ্ধি। মেয়ে যাতে সুখে শান্তিতে দাম্পত্য জীবন কাটাতে পারে, তার জন্য মঙ্গল কামনাতেই এই ষষ্ঠী পালন করা হয়।

মিষ্টির হাঁড়ি হাতে ফিনফিনে সাদা মসলিনের পাঞ্জাবি আর মালকোচা মারা ধুতিতে শ্বশুরঘর আলো করা জামাই বাবাজি আসেন। পঞ্চব্যঞ্জনে সাজনো জামাইয়ের পাত। আম-কাঁঠাল, ইলিষের পেটি কিংবা কচি পাঠাঁর মাংস সহযোগে ভুরিভোজ। আর তার আগে জামাইকে পাখা হাওয়া আর শান্তি জলের ছিটা দেওয়া। এমনকী, মা ষষ্ঠীর আশীর্বাদ বলে জামাইয়ের হাতে হলুদ মাখানো সুতো পরিয়ে দেওয়া।

তবে অনেকের মনে প্রশ্ন আসে মা ষষ্ঠীর সঙ্গে জামাইয়ের সম্পর্কটা কী? কীভাবে হয়েছিল জামাইষষ্ঠীর সূচনা? আর কেনই বা পেট পুজোর আয়োজন হয়। জামাইষষ্ঠীর প্রচলন হল কিভাবে? জানুন জামাইষষ্ঠীর ইতিকথা।

জামাইষষ্ঠীর প্রচলন হল কীভাবে?

বৈদিক যুগ থেকেই জামাইষষ্ঠী পালিত হয়ে আসছে। লোকায়ত প্রথা জামাইষষ্ঠী। ষষ্ঠীদেবীর পার্বণ থেকেই এই প্রথার উদ্ভব। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের ষষ্ঠী তিথিতে প্রথম প্রহরে ষষ্ঠীদেবীর পুজোর আয়োজন করা হয়। এইদিন ঘটা করে শাশুড়িরা যষ্ঠীর পুজো করেন। জামাইকে নেমন্তন্ন করে জামাইপুজো করেন শাশুড়িরা। এই পুজোয় সন্তানতুল্য জামাইয়ের মঙ্গল কামনা করা হয়। আবার কন্যা যাতে নিঃসন্তান না থাকে, সেই প্রার্থনাও করা হয় ষষ্ঠী দেবীর কাছে।

আসলে তৎকালীন সময়ের প্রচলিত বিশ্বাস ও সংস্কার অনুযায়ী কন্যা পুত্রবর্তী না-হওয়া পর্যন্ত মেয়ের মা-বাবা কন্যাগৃহে পা রাখবেন না। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় অনেক সময় সন্তানধারণে সমস্যা দেখা দিত। আবার সন্তান প্রসবের পরও মা অথবা শিশুর মৃত্যু হওয়ায় অনেক সময় বহু বছর ধরে মেয়ের মুখ দেখতে পেতেন না মা-বাবারা। এদিকে মেয়েকে দেখতে না-পেয়ে, মা-বাবার মনেও শান্তি নেই। বিবাহিত মেয়ের মুখ দর্শনের জন্য প্রচলিত হল এই জামাই ষষ্ঠীর রীতিনীতি।

কথিত আছে এক পরিবারে দুটি বউ ছিল ছোট বউ ছিল।খুব লোভী বাড়ির মাছ বা অন্যান্য ভাল খাবার রান্না হলেই সে লুকিয়ে লুকিয়ে খেয়ে নিত আর শাশুড়ির কাছে অভিযোগ করত ‘সব কালো বেড়ালে খেয়ে নিয়েছে। বেড়াল মা ষষ্ঠীর বাহন। তাই বেড়াল, মা ষষ্ঠীর কাছে অভিযোগ জানান।মা ষষ্ঠী রেগে যান।যার জেরে ছোট বউ-এর একটি করে সন্তান হয় আর মা ষষ্ঠী তার প্রাণ হরণ করেন। এইভাবে ছোট বউয়ের সাত পুত্র ও এক কন্যাকে মা ষষ্ঠী ফিরিয়ে নেন।

এরফলে স্বামী শাশুড়ি ও অন্যান্যরা মিলে তাকে ‘অলক্ষণা’ বলে গালিগালাজ করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। ছোট বউ মনের দুঃখে বনে চলে যান ও একাকী কাঁদতে থাকেন। শেষে মা ষষ্ঠী বৃদ্ধার ছদ্মবেশে তার কাছে এসে কান্নার কারণ জানতে চান। সে তার দুঃখের কথা বলে। তখন মা ষষ্ঠী তার পূর্বের অন্যায় আচরণের কথা বললে সে মাফ চায়।

মা ষষ্ঠী তাকে ক্ষমা করেন। এরপর বলেন ভক্তি ভরে ষষ্ঠীর পুজো করলে সাতপুত্র ও এক কন্যার জীবন ফিরে পাবে।তখন ছোট বউ সংসারে ফিরে এসে ঘটা করে মা ষষ্ঠীর পুজো করে এবং তার পুত্র কন্যাদের ফিরে পায়। এর পর চারিদিকে ষষ্ঠী পুজোর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে। এটাই জামাই ষষ্ঠী বা অরণ্যষষ্ঠী ব্রতকথার মূল গল্প।

শ্বাশুড়িরা কীভাবে ষষ্ঠী দেবীর পুজো করেন জেনে নিন?

ষষ্ঠী পূজার উপকরণ- আম পাতা, তালপাখার পাখা, ধান, দূর্বা, পাঁচ থেকে নয় রকমের ফল, ফুল এবং বেলপাতা, সাদা সুতো ও হলুদ। এই পুজোয় পাঁচ, সাত বা নয় রকমের ফল কেটে সাজিয়ে রাখা হয়। তবে এর মধ্যে অপরিহার্য হল করমচা। জামাই ষষ্ঠীর দিনে ষষ্ঠী পুজোর জন্য শ্বাশুড়িরা উপবাস থাকেন। সকালে ঘটের ওপর আম পাতা রাখা হয়, পাশে থাকে তালপাতার পাখা। একটি সুতো হলুদে রাঙিয়ে তাতে ফুল, বেলপাতা দিয়ে গিট বেঁধে তৈরি করা হয়। একে ষষ্ঠীর ডোর বলা হয়ে থাকে।

এবার দেবী ষষ্ঠীর পুজোর পালা।সকালে কাটা ফলের ডালি, সঙ্গে ফুল, দূর্বা, ষষ্ঠীর ডোর দিয়ে দেবী ষষ্ঠীর থানে অর্থাৎ স্থানে পুজো দিয়ে আসার রীতি পালন করেন। শাশুড়ি মায়েরা।এবার জামাইয়ের কপালে দইয়ের ফোঁটা দেওয়া হয়। সেই দূর্বার আঁটি ঘটের জলে ভিজিয়ে তালপাতার সঙ্গে ধরে তাঁকে হাওয়া করা হয়। এতে তাঁর নিজস্ব সন্তানও বাদ যান না।

এরপর জামাইয়ের কবজিতে ষষ্ঠীর ডোর বেঁধে পাখা দিয়ে হাওয়া করে শ্বাশুড়ি ষাট-ষাট বলে ধান ও দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করেন। জামাইকে আশীর্বাদ করে জামাকাপড় উপহার দেন। তার পর মিষ্টি ও ফল খেতে দেওয়া হয়। সঙ্গে বিস্তর খাওয়া দাওয়ার আয়োজন থাকে।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন অনেক রীতিনীতিই পাল্টে গিয়েছে। তবে জামাইষষ্ঠীর আসল উদ্দেশ্য বজায় রয়েছে, তা হল মাতৃত্ব, সন্তান ধারণ এবং বংশবৃদ্ধি। মেয়ে যাতে স্বামী গৃহে সুখে বসবাস করে, তাঁর দাম্পত্য জীবন যাতে সুখে কাটে, তার মঙ্গল কামনা করেন শ্বাশুড়ি মায়েরা।

Related Articles

Back to top button